26/08/2026
ক্লিনিকে প্রতিদিন এই একটি প্রশ্ন আমরা অসংখ্যবার শুনে থাকি। অনেকে ভাবেন, বিড়ালের লোম ঝরা মানেই ভিটামিনের অভাব, আর একটা syrup খাইয়ে দিলেই বোধহয় অলৌকিকভাবে লোম পড়া বন্ধ হয়ে যাবে!
কিন্তু সত্যিটা হলো—শুধু ভিটামিন খেয়ে কখনোই বিড়ালের লোম পড়া শতভাগ বন্ধ করা সম্ভব নয়।
লোম অতিরিক্ত পড়ার পেছনে লুকিয়ে থাকে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ:
১. আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক Shedding:
বিড়াল স্বাভাবিক নিয়মেই পুরনো লোম ফেলে নতুন লোম গজায়। বিশেষ করে আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় (যেমন শীতের শুরু বা গরমের শুরুতে) ওদের শরীরে 'Natural Shedding' এর পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যায়। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি শারীরিক প্রক্রিয়া।
২. বিড়ালের শরীরের ১/৩ ভাগ প্রোটিন লোম তৈরিতেই খরচ হয়:
বিড়ালের দৈনন্দিন গৃহীত মোট প্রোটিনের প্রায় ৩০% থেকে ৩৫% কেবল তাদের ত্বক সুস্থ রাখতে এবং নতুন লোম তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়। তাই খাবারে প্রোটিনের সামান্য ঘাটতি হলেই সবার আগে লোম পড়া শুরু করে।
৩. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ (Stress & Anxiety):
বিড়াল অত্যন্ত স্পর্শকাতর প্রাণী। বাসার পরিবেশ বদল, নতুন অতিথি বা পোষা প্রাণীর আগমন, একা থাকা, কিংবা বিকট শব্দ ওদের মানসিক চাপে ফেলে। আর অতিরিক্ত stress এর কারণে বিড়ালের প্রচুর লোম ঝরতে শুরু করে।
৪. Grooming বা যত্নের অভাব:
নিয়মিত গোসল না দিলে, আঁচড়ানো না হলে আলগা লোমগুলো শরীরের সাথে পেঁচিয়ে জট লেগে যায় এবং একসময় থোকা থোকা হয়ে ঝরে পড়ে। প্রতিদিন অন্তত ৫-১০ মিনিট সঠিক ব্রাশ দিয়ে আঁচড়ালে এই সমস্যা অনেকটাই কমে যায়।
৫. সূর্য ও আলোর খেলায় লোম পড়ার গতি নির্ধারিত হয়
বিড়াল যে ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে লোম ফেলে, তার মূল চালিকাশক্তি তাপমাত্রা নয়, বরং সূর্যের আলো (Photoperiod)। দিন বড় নাকি ছোট হচ্ছে, তা বিড়ালের চোখ দিয়ে মস্তিষ্কের পিনিয়াল গ্ল্যান্ডে (Pineal Gland) সংকেত পাঠায় এবং সে অনুযায়ী লোম পড়ার হরমোন নিঃসৃত হয়। তবে যেসব বিড়াল সারাদিন indoor এ AC বা কৃত্রিম আলোয় থাকে, তাদের সারা বছরই কম-বেশি লোম পড়ে।
৬. পরজীবী ও চর্মরোগ (Parasites & Fungal Infections):
শরীরে Fleas, Mites বা fungal infection হলে বিড়ালের ত্বকে তীব্র চুলকানি হয়। বিড়াল অতিরিক্ত চুলকালে বা কামড়ালে নির্দিষ্ট অংশের লোম একদম উঠে যায়।
বিড়ালের লোমের ঘনত্বের কারণে চামড়া খালি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু প্রতি এক বর্গ-ইঞ্চিতে বিড়ালের প্রায় ৬০,০০০ থেকে ১,২০,০০০ টি লোম থাকে (যেখানে মানুষের মাথায় থাকে মাত্র ১,০০০ টি)! তাই চামড়ায় কোনো fungus বা পরজীবী আক্রমণ করলে লোমের এই বিশাল follicle গুলো ধ্বংস হয়ে লোমের গোছা গোছা চটে উঠে যায়।
এমনকি অতিরিক্ত কৃমির সমস্যাও হতে পারে লোম পড়ার অন্যতম কারণ।
৭. খাদ্যাভ্যাস ও অ্যালার্জি (Diet & Food Allergy):
সঠিক প্রোটিন এবং ফ্যাটি এসিডের (Omega-3 & Omega-6) অভাব থাকলে লোমের গোড়া দুর্বল হয়ে যায়। এছাড়া খাবারে Allergy থাকলেও চর্মরোগ ও লোম পড়ার সমস্যা দেখা দেয়।
৮. ভেতরের কোনো সুপ্ত রোগ (Internal Health Issues):
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, liver বা kidney এর সমস্যা এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ জটিলতার অন্যতম প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে অতিরিক্ত লোম পড়া।
তাছাড়া গর্ভবতী বা Lactating এমন মা-বিড়ালের শরীরে estrogen ও progesterone হরমোনের তীব্র ওঠানামা হয়। ফলে সন্তান জন্মদানের পর প্রচুর লোম একযোগে ঝরে পড়তে দেখা যায় (যাকে Telogen effluvium বলা হয়)।
অনেক সময় বিড়ালের পেটের দুই পাশে বা পেছনের পায়ে লোম গোল হয়ে উঠে যায় (Symmetrical Alopecia)। পেট প্যারেন্টরা ভাবেন এটি চর্মরোগ, কিন্তু ভেটেরিনারি সায়েন্স বলে—এটি অনেক সময় অভ্যন্তরীণ pancreatic tumour, adrenal gland এর অতি-সক্রিয়তা (Cushing's-like Syndrome) বা বিষণ্নতা (Psychogenic Alopecia) থেকে হতে পারে।
৯. পানির কমতিও লোম পড়ার বড় কারণ
বিড়াল স্বভাবতই কম পানি খায়। শরীরে Dehydration দেখা দিলে Skin Elasticity কমে যায় এবং লোমের follicle দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাহলে করণীয় কী?
অযথা যেকোনো ভিটামিন কিনে না খাইয়ে, আগে ডাক্তার এর কাছে নিয়ে checkup করিয়ে লোম পড়ার আসল কারণ চিহ্নিত করুন। আপনার সঠিক সময়ের সঠিক পদক্ষেপ ই প্রিয় বিড়ালের সুস্থ প্রানচঞ্চল জীবন নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে। 🐾