08/10/2021
Zebra finch(জেব্রা ফিঞ্চ)
আজকে আমরা আলোচনা করব ফিঞ্চ পরিবারে সবচেয়ে জনপ্রিয় সদস্য, জেব্রা ফিঞ্চ নিয়ে। সকল জেব্রা ফিঞ্চ পালককে অনুরোধ করবো একটু সময় নিয়ে পড়ার, সময় না পেলে অন্তত ৮ নাম্বার পয়েন্ট (ব্রিডিং) টা পড়ুন। আশা করছি কিছুটা হলেও উপকৃত হবেন।
১। দৈহিক গঠন :
জেব্রা ফিঞ্চের ঘাটি হল অস্ট্রেলিয়া। লেজসহ লম্বায় ৩.৫ থেকে ৪ ইঞ্চি, ওজন ১২-১৬ গ্রাম। ঠোঁট এবং পা টুকটুকে লাল বা কমলা রং এর। চোখের নিচ দিয়ে একটি ছোট কালো দাগ চলে গেছে কান বরাবর। প্রজাতি ভেদে বিভিন্ন রং এর হয়ে থাকে।
২। মিউটেসন বা জাত :
জেব্রা ফিঞ্চের বেশ কিছু মিউটেসন আছে। এদের মধ্যে গ্রে, ফন, হোয়াইট, পাইড, ক্রেস্টেড, ব্লাক চিক (BC), ব্লাক ফেস (BF), ব্লাক ব্রেস্ট (BB), চেস্টনাট ফ্লাঙ্কড হোয়াইট (CFW), পেঙ্গুইন, ইসাবেল/ফ্লোরিডা ফেন্সি, সিলভার, ক্রেস্টেড (CR), ননক্রেস্টেড (NNCR) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। আমরা সচরাচর যেটা দেখে থাকি সেটা হলো গ্রে, এ্যাশ কালার বুঝি আমরা যেটাকে, একে নরমাল জেব্রাও বলা হয়।
৩। আচার-আচরণ :
প্রকৃতিতে জেব্রা ফিঞ্চ কলোনী তে বসবাস করে। দলবেঁধে প্রতিদিন ২-৪ বার খাবারের সন্ধানে বের হয়। ঘাসযুক্ত ভূমিতে বিচরণ করতে বেশি ভালোবাসে। যার যার ঘরের আশেপাশেই বেশি সময় কাটায়। লংটেইল, গোল্ডিয়ান সহ অন্যান্য ফিঞ্চদের সাথেও বেশ সুসম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। খাঁচায় কেমন আচরণ করে তা আমরা সকলেই জানি ! এক জায়গায় স্থির হয়ে বসার সময় এনাদের নাই। যার জন্য দ্রুত ক্ষুদা লেগে যায় এবং বারবার খাবার ও পানি খেতে দেখা যায়। খাচায় দড়ি বা চুল জাতীয় সুক্ষ কিছু থাকলেও খুঁজে বের করা এনাদের অন্যতম প্রধান কাজ ! এরা গোসল করতে খুবই পছন্দ করে, তাই নিয়মিত গোসলের পানি দেওয়া জরুরী।
৪। খাঁচা :
সাইজে ছোট বলে আমরা মনে করি ফিঞ্চকে কোনরকম একটা খাঁচা দিলেই হবে। এটা মোটেই ঠিক না। তারা যে প্রচন্ড ওড়াউড়ি, ছোটাছুটি করে সেটা মাথায় রাখতে হবে। ব্রিডিং এর সময় ১ জোড়া পাখির জন্য ২০”১৬”১৮ সাইজের খাঁচা সর্বোত্তম। জায়গার সমস্যা থাকলে ১২”১৮”১৮ বা ১৮”১২”১৮ করে দিতে পারেন। ব্রিডিং ছাড়া অন্য সময় ১৮”২০ বা ২৪”১৮”২৪ এমন সাইজের খাঁচায় একসাথে ৩-৪ জোড়া রাখবেন। ইচ্ছা করলে এমন ভাবেই কলোনীতে ব্রিড করাতে পারেন।
৫। খাবার-দাবার :
ফিঞ্চের সবচেয়ে প্রিয় খাবার হলো মিলেট। খাঁচায় আমরা এদের প্রধান খাবার হিসেবে কাউন দিয়ে থাকি, এটাও এক ধরণের মিলেট। সীডমিক্সে কাউনের পাশাপাশি চীনা, তিশি, গুজিতিল, ক্যানারি, পোলাও ধান ইত্যাদি দেওয়া যায়। পালং, সরিষা, কলমি, পুই, লাল ইত্যাদি শাক, ধনেপাতা, নিমপাতা, সজনে পাতা সপ্তাহে ৩-৪ বার দেওয়া উচিৎ। ক্যালসিয়ামের জন্য সর্বদা খাঁচায় কাটেল ফিস বোন রাখতে হবে, ডিমের খোসা ধুয়ে শুকিয়ে গুড়া করেও দেওয়া যায়। AtoZ mineral block খাচায় ঝুলিয়ে রাখা যায়, প্রোটিনের জন্য এগফুড বা মেলওয়ার্ম বা পিপড়ার ডিম দেওয়া জরুরী। এছাড়া সপ্তাহে ১-২ বার এসিভি, ঘৃতকুমারির দ্রবণ, তুলসি দ্রবণ খাওয়ালে পাখি সুস্থ থাকবে, অসুখ-বিসুখও অনেক কমে যাবে।
৬। বয়স নির্ধারণ :
ক. ১.৫ থেকে ২ মাস বয়সে প্রথম মোল্টিং হওয়ার আগ পর্যন্ত বাচ্চার চোখের নিচের কাল দাগ এবং লেজের ডোরাকাটা দাগ থাকে অস্পষ্ট। ৩ মাস বয়সের মধ্যে মোল্টিং শেষ হয় এবং এই দুইটা জিনিস স্পষ্ট ভাবে দেখা যায়। শরীরের রং ও উজ্জ্বল হতে থাকে।
খ. মোল্টিং এর আগ পর্যন্ত সময় টা বাচ্চার ঠোট থাকে কালো বা গাড় বাদামী। আস্তে আস্তে কমলা বা লাল রং হতে থাকে এবং মোল্টিং শেষ হলে, অর্থাৎ ৩ মাস + বয়স হয়ে গেলে দেখা যায় সেটা টকটকে লাল বা কমলা রং ধারণ করেছে।
গ. এ্যাডাল্ট পাখি একসাথে অনেক্ষণ ধরে ডাকতে পারে, কিন্ত বাচ্চারা শুধু মৃদু সরে থেমে থেমে ডাকে।
৭। ছেলে-মেয়ে নির্ধারণ :
ক. ২ মাসের কম বয়সী পাখির ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ে বোঝা বেশ কষ্টের। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গাঢ় রং এর বাচ্চাগুলো ছেলে এবং হালকা গুলো মেয়ে হতে দেখা যায়।
খ. এ্যাডাল্ট হওয়ার পর, অর্থাৎ ৩ মাসের বেশি বয়সী পাখির ক্ষেত্রে ছেলেদের কানের অংশটা গাঢ় কমলা রং এর হয়ে থাকে, যাকে ইংরেজিতে “চিক” এবং বাংলায় দুল বা লতি বলা হয়। বুকে সাদা-কালো ফোটা ফোটা, পেট টা ধবধবে সাদা। ডানা দুটো গ্রে বা ধূসর রং। ডানার নিচ দিয়ে খয়েরি ও সাদা রং এর ছিটাফোটা কারুকার্য। মেয়ে পাখির ক্ষেত্রে এসব কিছুই দেখা যায় না। সারা শরীরটাই এক ঢালা রং তবে লেজের ডোরাকাটা দাগ এবং চোখের নিচের কাল দাগ টা উপস্থিত থাকে।
গ. ছেলেদের ঠোঁট হয় গাঢ় লাল রং এর, মেয়েদের হালকা লাল বা কমলা রং।
ঘ. ছেলেরা গলা ফুলিয়ে খুব জোরে একটানা ডাকতে পারে, এটা ফিমেলের পক্ষে সম্ভব না, এরা অনেকটা বাচ্চাদের মতই ডাকে।
৮। ব্রিডিং :
জেব্রা ফিঞ্চ ৩-৪ মাসে এডাল্ট হলেও অন্তত ৬ মাসের আগে ব্রিডে দেওয়া উচিৎ না, ফিমেল আরো ১-২ মাস বেশি হলে ভাল হয়। ব্রিডিং এর বেশ কয়েকটা ধাপ আছে। সব গুলোর দিকেই লক্ষ্য রাখা জরুরী। আমি নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করলাম –
ক. মেটিং :
আগে যেমনটা বললাম, ছেলে পাখি মেয়েটাকে আকর্ষণ করার জন্য তার সামনে গিয়ে এবং চারপাশ জুড়ে গলা ফুলিয়ে উচ্চস্বরে একটানা ডাকতে থাকে। মেয়েটা কবুল করলে শুভ কাজ সম্পন্ন হবে ! এসময় ওদেরকে যথেষ্ট পরিমাণে প্রাইভেসি দেওয়া জরুরী।
খ. নেস্ট বক্স বা হাড়ি :
মেটিং করার আগে না দিয়ে থাকলে মেটিং করতে দেখার সাথে সাথে অবশ্যই হাড়ি বা বক্স দিতে হবে। যথাসম্ভব উপরে, খাঁচার ছাদের সাথে লাগিয়ে দিবেন। হাড়ি ব্যবহার করলে অবশ্যই উপরের মুখ ঢেকে দিতে হবে, যাতে আলো না যায়। আলো গেলে ওদের প্রাইভেসি নষ্ট হয়।
গ. নেস্টিং ম্যাটেরিয়াল :
হাড়ি বা বক্সে নিজে থেকে কিছু দিতে যাবেন না। ওদের বাসা ওদেরকেই বানিয়ে নিতে দিন। বাসা বানানোর জন্য নেস্টিং ম্যাটেরিয়াল হিসেবে শুকনা দুর্বা ঘাস বেস্ট। না পাওয়া গেলে নারকেলের ছোবড়াও দেয়া যায়।
একটা সমস্যার কথা অনেকেই বলেন, সেটা হলো ডিম বা বাচ্চা গায়েব হয়ে যাওয়া। জানেন সেটা কেন হয়?? প্রথমত টিকটিকি, ইঁদুর ডিম বাচ্চা খেয়ে ফেলে এবং দ্বিতীয়ত যেকোন ফিঞ্চ নেস্টিং করতে, অর্থাৎ বাসা বানাতে খুব পছন্দ করে। সেজন্য ডিম পাড়া শুরু করার পরও তারা নেস্টিং করতেই থাকে, ফলে আগের ডিম গুলো নিচে চলে যায়, অনেক সময় চাপে ভেঙ্গেও যায়। আবার অতিরিক্ত নেস্টিং করার কারণে বাসার তলা টা হাড়ি বা বক্সের মুখের কাছে উঠে আসে এবং ডিম বা বাচ্চা সহজেই গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়। এই সমস্যা গুলোর সমাধান হলো, নেস্টিং এর সময় প্রতিদিন মাত্র ১ মুঠ নেস্টিং ম্যাটেরিয়াল দিতে হবে এবং হাড়ি বা বক্সের মুখ থেকে অন্তত ১ ইঞ্চি নিচে থাকতেই নেস্টিং ম্যাটেরিয়ালের সরবরাহ বন্ধ করতে হবে।
ঘ. ডিম :
মেটিং করার দিন দশেকের মধ্যেই মেয়ে পাখি ডিম পাড়া শুরু করে। সাদা রং এর, মটরশুটির দানার মত ছোট্ট ছোট্ট ডিম, ওজন ১ গ্রামের চেয়েও কম। ১ টা থেকে ৮ টা পর্যন্ত পাড়তে পারে, তবে সাধারণ ক্লাচ ৪-৬ টা। প্রথম ২-৩ টা ডিম দেওয়ার পর শুরু হয় তাপ দেওয়া। ছেলে ও মেয়ে উভয়ে তা দেয়।
গরমের শুরুতেই অনেকে আমার কাছে অভিযোগ করেছিলেন যে, ফিঞ্চ ডিম থাকা সত্বেও বক্সে ঢুকছে না। অনেকে বলেছিলেন রাতে তা দেয়, কিন্ত দিনে দেয় না। এর কারণটা হল বক্সের মধ্যে বাতাস চলাচলের কোন সুযোগ নেই এবং পাখি ভিতরে বসলে নেস্টিং ম্যাটেরিয়ালের কারণে শরীর প্রচন্ড গরম হয়। ৩০ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপমাত্রা পাখি সহ্য করতে পারে, কিন্ত তারপর আর এই পুচকি দের পক্ষে ওর মধ্যে টিকে থাকা সম্ভব হয় না। সেজন্যই ওরা বাইরে বের হয়ে আসে এবং রাতের বেলা ঠান্ডা থাকে বলে আবার তাপ দেওয়া শুরু করে। ছোট্ট বাবু গুলোর যে কত কষ্ট হচ্ছে তা একবারও কেউ ভাবে না, উল্টা বলে পাখি খারাপ ! বেচে দিব ! হেনতেন কত কি !
যাই হোক, এটা ঘটে বলেই গরমকালে পাখিকে ব্রিডিং এ দিতে নেই। আর দিলেও ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং মাটির হাড়ি ব্যবহার করতে হবে।
ঙ. বাচ্চা :
সবকিছু ঠিক থাকলে ১২-১৪ দিনের মধ্যেই ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বের হয়। বাচ্চা গুলো থাকে একটু লোমশ টাইপের। ৭-৮ দিনের মধ্যেই চোখ ফোটে। ২০-২২ দিনের মধ্যে পালক মোটামুটি উঠে যায় এবং মাসখানেকের মধ্যেই বাচ্চা ভালমত উড়তে শেখে, বাবা-মা থেকে আলাদা করার উপযোগী হয়। বাচ্চার সাথে সাথে বক্স বা হাড়িও সরিয়ে নিতে হবে। এই সময়টাতে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার গুলো, বিশেষ করে এগফুড, মেলওয়ার্ম, ক্যানারি বেশি দিতে হবে এবং পাখির পর্যাপ্ত প্রাইভেসি নিশ্চিত করতে হবে। বছরে ২ থেকে ৩ বারের বেশি ব্রিড করানো অনুচিৎ।
চ. রেস্ট বা বিশ্রাম :
যেমনটা আগে বললাম, ব্রিডিং শেষ হলে বড় সাইজের খাঁচায় ৩-৪ জোড়া একসাথে রাখা যাবে। ডিম পাড়া সম্ভব এমন কিছু, যেমন বড় খাবারের পাত্র খাঁচায় রাখা যাবে না। ছোট পটে বা ফুড হপারে খাবার দিতে হবে। এছাড়া সব ছেলে পাখিকে এক খাঁচায় এবং মেয়ে পাখি গুলোকে আরেকটি খাঁচায় একসাথে রেখেও বিশ্রাম দেওয়া যায়।
৯। অসুখ-বিসুখ :
আমাদের দেশে ফিঞ্চের যেই সমস্যাটা সবচেয়ে বেশি হয় তা হল ঠান্ডা লাগা এবং এটা এই ধরণের ঠান্ডা-গরম আবহাওয়াতেই সবচেয়ে বেশি ঘটে। তুলসি দ্রবণ বা এসিভি খাটি মধু সহ খাওয়ালে এবং নিয়মিত রোদে দিলেই পাখি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে। প্রতিরোধের জন্য এগুলা পাখিকে আগে থেকেই নিয়মিত খাওয়াতে হবে, পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত ২-৩ বার রোদে রাখতে হবে। চেষ্টা করতে হবে দিনের এবং রাতের বেলার তাপমাত্রা কাছাকাছি রাখার, সেটা ফ্যান চালিয়েই হোক, বা ১০০ ওয়াটের বাল্ব জ্বালিয়েই হোক।