30/04/2026
হ্যামস্টার আসলে কী?
হ্যামস্টার ওয়েলফেয়ার বাংলাদেশ (HWBD)-এর “হ্যামস্টার এডুকেশন” সিরিজে আপনাকে স্বাগতম। কোনো প্রাণীর সঠিক যত্ন নিতে চাইলে আগে জানতে হবে সেই প্রাণীটি আসলে কী। অনেক সময় হ্যামস্টারকে জীবন্ত প্রাণী হিসেবে না দেখে খেলনার মতো দেখা হয়, বাচ্চাদের পেট জন্য ধরা হয়, তুচ্ছ করে দেখা হয়। অথচ এদের পেছনে রয়েছে লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের ইতিহাস।
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় কীভাবে সঠিক সেটাপ বানাবেন বা কী খাবার দেবেন, তার জানার আগে দরকার ভুল ধারণা দূর করা। জানতে হবে এরা কোথা থেকে এসেছে, নামের অর্থ কী, আর কত সময় আগে এরা মানুষের পোষা প্রাণি হিসেবে ঘরে এসেছে।
হ্যামস্টারের আচরণ বুঝতে হলে এর নামই যথেষ্ট। “Hamster” শব্দটি এসেছে ১০৫০ থেকে ১২৫০ সালের মধ্যে ব্যবহৃত মিডিয়া হাই জার্মান ভাষার “hamstern” থেকে, যার অর্থ “জমিয়ে রাখা” বা “মজুদ করা”। এই শব্দের শিকড় আরও পুরোনো জার্মান শব্দ “hamustro” পর্যন্ত পৌঁছায় [1]। ইংরেজি শব্দ ‘hamster’ প্রথম ১৬০০-এর দশকের গোড়ার দিকে নথিভুক্ত হয়েছিল (বিশেষত ১৬০৭ সালের কাছাকাছি সময়ে) ইংরেজ ধর্মযাজক ও লেখক এডওয়ার্ড টপসেলের লেখায়। “হ্যামস্টার” এর জন্য বাংলা কোনো একক শব্দ না থাকলেও বাংলা অভিধানে একে “ধেড়ে ইঁদুরের ন্যায় প্রাণিবিশেষ” হিসেবে উল্লেখ করা আছে। তবে বাংলাদেশে এর নাম ইংরেজি নাম, অর্থাৎ “হ্যামস্টার” বলেই সর্বত্র পরিচিত।
এই নামের পেছনে আছে স্পষ্ট জৈবিক কারণ। হ্যামস্টারের দুই পাশে থাকে বিশেষ ধরনের থলি বা পাউচ। এই থলিগুলো মুখ থেকে কাঁধ পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে। প্রাকৃতিক পরিবেশে খাবার সবসময় পাওয়া যায় না। তাই এরা একবার খাবার পেলে অনেকটা সংগ্রহ করে গালের ভেতরে ভরে রাখে। পরে নিরাপদ গর্তে গিয়ে জমা করে।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। হ্যামস্টারের খাবার জমা করা কোনো মজার অভ্যাস না। এটি বেঁচে থাকার প্রবল প্রবৃত্তি। যদি হ্যামস্টারের কাছে লুকানো খাবার না থাকে, তাহলে সে মানসিক চাপের মধ্যেও থাকে পারে।
পোষা প্রাণীর দোকানে ছোট রঙিন খাঁচায় বসে থাকা হ্যামস্টারকে দেখে আসল পরিবেশ বোঝা যায় না। বৈজ্ঞানিকভাবে হ্যামস্টার “Cricetinae” উপপরিবারের সদস্য। এরা জঙ্গল বা ঘন বনাঞ্চলের প্রাণী না। এদের বাস ইউরেশিয়ার বিশাল শুষ্ক অঞ্চলজুড়ে। মধ্য ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে উত্তর চীন পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা। এখানে থাকে আধা-মরুভূমি, খোলা ঘাসভূমি, কাদামাটির সমতল আর উর্বর স্টেপ অঞ্চল [2]।
এই পরিবেশ বেশ কঠিন। দিনে প্রচণ্ড গরম, রাতে তীব্র ঠান্ডা। এই অবস্থায় টিকে থাকার জন্য হ্যামস্টার মাটির নিচে বাস করার জন্য বিবর্তিত হয়েছে।
প্রাকৃতিক পরিবেশে একটি হ্যামস্টার দুই মিটার বা তার বেশি গভীর গর্ত খুঁড়ে। এই গর্তে থাকে আলাদা আলাদা কক্ষ। ঘুমানোর জায়গা, খাবার রাখার জায়গা, এমনকি মলত্যাগের জায়গাও আলাদা থাকে [3]।
মাটির নিচের এই গর্ত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং শিকারিদের থেকে রক্ষা করে। এখান থেকেই পেট হ্যামস্টানেন একটি গুরুত্বপূর্ণ যত্নের নিয়ম আসে। হ্যামস্টারের খাঁচায় অন্তত ১৫ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার (৮ থেকে ১০ ইঞ্চি) গভীর, চাপা দেওয়া নিরাপদ বেডিং থাকা উচিত তবে ন্যূনতম ১২ থেকে ১৪ সেন্টিমিটার (৫ থেকে ৬ ইঞ্চি) বেডিং থাকা বাধ্যতামূলক। বেডিং এমন হওয়া উচিত যাতে তারা সেটাতে গর্ত করতে পারে। গর্ত খোঁড়ার সুযোগ না থাকলে তাদের স্বাভাবিক আচরণে সমস্যা হয়, স্ট্রেসড হয়ে পড়ে যা তাদের স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে।
কুকুর বা বিড়ালের মতো হাজার বছরের সম্পর্ক হ্যামস্টারের নেই। এরা গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে একদম নতুন।
সিরিয়ান হ্যামস্টার (Mesocricetus auratus) প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে বর্ণনা করেন ব্রিটিশ প্রাণীবিজ্ঞানী George Robert Waterhouse, ১৮৩৯ সালে। এরপর প্রায় একশ বছর ধরে এই প্রাণীটিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেকেই মনে করেছিলেন এটি বন্য পরিবেশে বিলুপ্ত [4]।
পরিবর্তন আসে ১৯৩০ সালে। প্রাণীবিজ্ঞানী Israel Aharoni সিরিয়ার আলেপ্পোর কাছে একটি কৃষিক্ষেতে মাটির গভীর গর্ত থেকে একটি মা হ্যামস্টার ও তার বাচ্চাদের উদ্ধার করেন।
এই অল্প কয়েকটি হ্যামস্টারকে তৎকালীন ফিলিস্তিনের জেরুজালেমের একটি ল্যাবে নেওয়া হয়। তারা দ্রুত বংশবিস্তার করে এবং তাদেরকে ল্যাবে রাখাও সহজ ছিল। পরে তাদের বংশধরদের অন্য দেশে পাঠানো হয়। ১৯৩১ সালে যুক্তরাজ্যে এবং ১৯৩৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছায়। ১৯৪০-এর দশকের শেষে তারা ল্যাব প্রাণী থেকে জনপ্রিয় পোষা প্রাণীতে পরিণত হয় [5]।
এই সময়সীমা লক্ষ্য করুন। আধুনিক পোষা হ্যামস্টার একশ বছরেরও কম সময় ধরে মানুষের সঙ্গে আছে। তাই তাদের স্বভাব এখনো বন্য পরিবেশের মতোই রয়ে গেছে।
আপনি যদি একটি হ্যামস্টার পালন করেন, তাহলে আপনি আসলে এমন একটি প্রাণীর যত্ন নিচ্ছেন, যার শরীর ও মস্তিষ্ক এখনো অনেকটা ইউরেশিয়ার কঠিন স্তেপ অঞ্চলের জন্য তৈরি। পুরোপুরি গৃহপালিত হতে এদের আরো অনেক সময় লাগবে।
রেফারেন্স:
1. Fox, J. G. (2007). The Mouse in Biomedical Research: History, Wild Mice, and Genetics (Vol. 1). Academic Press.
2. Feoktistova, N. Y., Surov, A. V., Tovpinetz, N. N., et al. (2013). The common hamster as a synurbist: a history of settlement in European cities. Zoologica Poloniae, 58(3-4), 116–129.
3. Rusin, M. Y., Banaszek, A., & Mishta, A. V. (2013). The common hamster (Cricetus cricetus) in Ukraine: evidence for population decline. Folia Zoologica, 62(3), 207–213.
4. Murphy, J. C. (1985). The Syrian Hamster: A Review. Laboratory Animal Science.
5. Winnicker, Christina, and Kathleen R. Pritchett‐Corning. “The Syrian hamster.” The UFAW Handbook on the Care and Management of Laboratory and Other Research Animals (2024): 419-429.