01/11/2025
ডাকিনী- পর্ব ২
_________________
একটা ফার্মেসী থেকে কিছু জিনিসপত্র কিনে চৈতী। সেনোরা প্যাড,ক্ষত শুকানোর মলম, ড্রেসিং করার গজ কাপড়, তুলা এবং কয়েকটা পেইন কিলার। বাজার থেকে কিছু কমলা ও আপেল কিনে নিয়ে সে পা বাড়ায় বাড়ির দিকে।
স্কুলে আজও খুব কম ছাত্রছাত্রী ছিলো। দু- একজন এসে হাজিরা দিয়ে গেছে। পুরো গ্রামের পরিবেশ ছিলো বেশ শান্ত ও থমথমে। গত ক' দিনে যা যা ঘটেছে সেটা বিকৃত ও ভয়ানক ঘটনা হয়ে লোকমুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
হঠাৎ করে দু'বছর আগে এ মফস্বলের সবথেকে ভাঙ্গাচোরা তালাবদ্ধ বাড়িতে এসে উঠেন একজন অতিশয় বৃদ্ধ মহিলা। বয়সের ভাড়ে কুজো হয়ে লাঠি ভর দিয়ে হাঁটতেন তিনি৷ সারাদিন মহল্লার এঘর- ওঘর করে বেড়াতেন। কিছু মানুষ বিরক্ত হত, কেউ কেউ আবার এ বৃদ্ধার বাসায় আগমনকে সৌভাগ্য হিসেবে দেখতেন। কেউ কেউ বাসায় ভালো মন্দ রান্না হলে কিংবা কোনো সুখবর শুনলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তাকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াতেন।
চৈতীর কাছেও প্রায়শই আসতেন তিনি। চৈতী সেই বৃদ্ধার সাথে টুকটাক কথাও বলেছে এর আগে । জিজ্ঞেস করেছিলো আপনি এতদিন পর কেন ও কিভাবে এলেন এই গ্রামে!! বৃদ্ধা সেদিন কেঁদে কেঁদে বলেছিলেন, এটা তার এক দুঃসম্পর্কের নাতীর বাড়ি। ছেলের বউয়ের সাথে ঝামেলা করে এখানে এসে কিছুদিন গা ঢাকা দিয়েছেন। ছেলে ও ছেলের বউ যখন নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চাইবেন তখন তিনি আবার তাদের সাথে চলে যাবেন।
সেদিনের সেই বৃদ্ধা মহিলার কথা বিশ্বাস করে আসলে চরম ভাবে প্রতারিত হয়েছিলো চৈতী। ঐ বৃদ্ধা আর কেউ নয় বরং দিভা ছিল। সে বৃদ্ধার বেশে ঘুরে বেড়াত পুরো গ্রাম। অথচ কথা বলার সময়ে তার গলার কাঁপুনি, হাঁটাচলা, অভ্যেস আচরণ দেখে কোনো ভাবেই বোঝা যায়নি সে একজন ছদ্মবেশী তুখোড়, অভিনেত্রী। বৃদ্ধা কিংবা বৃদ্ধ মানুষদের নিয়ে গ্রামের মানুষের ভাবনা চিন্তা করার সময় কম। এতদিন ধরে পরিপাটি সাদা কাপড়ে ঘুরে বেড়ানো বৃদ্ধাকে নিয়ে কেউ কোন কথা বলেনি। কখনো সে আলাদা ভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়নি।তবে ঘটনার দিন থেকেই মফস্বল থেকে সেই বৃদ্ধা উধাও। লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছে উনি একজন ডাইনী ছিলেন।
যে কিনা ছোট বাচ্চাদের মাথা খেয়ে নেয়। সুযোগ পেলে বড়দের ও ছাড়েনা।
এসব কথা কানে আসলে বেশ অস্বস্তি হয় চৈতীর। পুরো ঘটনাকে চৈতী বারবার মনে করতে চায় না৷ সকালে দিভার অনুমতি ব্যাতিতই তার ব্যাগ চেক করেছিল চৈতী৷ সেখানেই সে খুঁজে পায় দিভার ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ানোর কস্টিউম, কয়েকটা ছোট বড় ধারালো ছুড়ি, কিছু অজানা ঔষধ, মাত্র একপিস অবিশিষ্ট থাকা সেনোরা প্যাডের প্যাক এবং কিছু টাকাপয়সা।
মাথার উপর সূর্য প্রখর আলো দিচ্ছে।হাঁটতে হাঁটতে চৈতীর গলা শুকিয়ে আসে। সে আরো জোড়ে পা চালায়।
ঔষধের দোকান থেকে যখন চৈতী জিনিসপত্র কিনছিল, তখন তাকে দূর থেকে দাঁড়িয়ে গোপনে লক্ষ্য করছিলো জুনিয়র পুলিশ অফিসার বর্ণ। চৈতী দোকান থেকে চলে যেতেই বর্ণ সেখানে আসে। ফার্মেসীর লোকটাকে জিজ্ঞেস করে চৈতি কি কি কিনে নিলো, লোকটি প্রথমে বলতে না চাইলেও বর্ণের পরিচয় শোনার পরে সবকিছু বলতে বাধ্য হয়। বর্ণ এটাও জানতে পারে চৈতী সব সময় ফ্রিডম প্যাড ইউজ করে। কিছুদিন আগেই সে নিজের জন্য ফ্রিডম এর আস্ত প্যাক নিয়েছে। তাহলে এখন সেনোরা প্যাড নিলো কার জন্য? গজ, তুলো, ব্যাথানাশক ঔষধের ই বা এখন তার কি দরকার হতে পারে?
বর্ণ মনে মনে যেটা ভাবছিলো সেটা সত্য হওয়ার সম্ভাবনা দশ পার্সেন্ট থেকে ত্রিশ পার্সেন্ট এ চলে গেলো।
বাসায় ঢুকে চৈতী দেখতে পায় তার মায়ের রুমের বিছানায় অ্যাটিভান টূ এম জী নামের ঔষধের খালি প্যাকেট পরে আছে । এটি একটি মারাত্মক ঘুমের ঔষধ। অজ্ঞান পা র্টির লোকেরা সাধারণত এ ঔষধের গুড়া খাইয়ে দিয়ে মানু্ষকে অজ্ঞান করে ও ছিনতাই করে। দিভার ব্যাগের ভেতরে এ ঔষধগুলো দেখেছিলো চৈতী।কিন্তু সেগুলো তার মায়ের বিছানায় কি করে এলো!
অজানা ভয়ে হৃদয়ে হঠাৎ কম্পন উঠে যায় চৈতীর। সে দৌড়ে তার মায়ের কাছে যায়। শরীরে হাত রেখে অনুভব করে হিমশীতল হয়ে আছে তার মায়ের দেহ। কান্নাজড়িত চিৎকারে না, এটা সত্যি হতে পারে না.. বলে, সে তার মায়ের নিশ্বাস পরীক্ষা করে। হৃদপিণ্ড রক্ত পাম্প করছে না। হৃদস্পন্দন নেই, বাতাসের আসা যাওয়া নেই। নিথর হয়ে গেছে চৈতীর মা। চৈতী এটা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না।
মায়ের শীতল হাত ধরে সে ডুকরে ডুকরে কান্না করতে থাকে। এতদিনের এত লড়াই, সংগ্রাম এবং কষ্ট, সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে এভাবে তার মা চলে যাবে সেটা সে ভাবতেও পারেনি। চৈতী একটা ভীষণ বড় ভুল করেছিলো। সে দিভার ব্যাগ থেকে সবগুলো ঔষধ বের করে তার মায়ের বিছানার পাশের টেবিলে রেখে গিয়েছিলো। বৃদ্ধ মানুষ, হয়ত না বুঝেই ঔষধ খেয়ে নিয়েছে! নইলে এত আকস্মিক মৃত্যুর অন্য কোন কারণ থাকতে পারে না। চৈতী প্রচন্ড অপরাধবোধ এবং মা হারানোর শোকে ভেঙ্গে পড়ে।দিভার কথা মনে পড়তেই সে দিভার রুমে ছুটে যায়। গিয়ে দেখে সেখানেও ভয়াবহ অবস্থা। দিভা বিছানা থেকে নিচে পড়ে গেছে। তার কপাল কেটে রক্ত ছড়িয়ে পরেছে চারদিকে। জ্ঞান হীন অবস্থায় পড়ে আছে। চৈতী কাছে গিয়ে দিভার কপালে ড্রেসিং করে দেয়। দিভার শরীর অতিরিক্ত গরম মনে হচ্ছ। হয়ত জ্বর এসেছে। কিন্তু চৈতী দিভার জন্য বেশি কিছু করতে পারলো না। ফ্লোর থেকে তাকে বিছানায় তুললো না। মাথায় ড্রেসিং করে ব্যান্ডেজ করে রেখে সে মেম্বার চাচাকে কল দিলো। পুরোটা সময়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না করে যাচ্ছিলো চৈতী। অজ্ঞান হওয়ার ভাণ করে সবকিছুই শুনছিলো দিভা৷
কোন এক কারণে চৈতীর কান্না শুনে দিভারও খারাপ লাগছিলো।
দিভা মানসিক ভাবে খুব শক্ত একজন মেয়ে। তার মনে খারাপ লাগা ভালো লাগার অনুভূতি খুব সহজে আসে না। তবে চৈতীর কান্না তার মনের ভেতরে ভীষন গভীর কালো মেঘের আস্তরণ সৃষ্টি করেছে।
চৈতীর মা' কে শেষ বিদায় জানাতে অনেক লোকজন এসেছিলো।
বিশেষ করে চৈতী যাদের পড়ায় তাদের বাবা মা, গ্রামের মেম্বার এবং মুরুব্বিরা। সবার মুখে একই কথা, মেয়েটা মায়ের জন্য অনেক চেষ্টা করছিলো। অনেক কষ্ট করছিলো। নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ টাও মায়ের জন্যই এই গ্রামে থেকে নষ্ট করে দিলো। এত ত্যাগ আজকাল কোনো মা,তার মেয়ের জন্য করে না৷ জীবদ্দশায় চৈতীর মায়ের খারাপ অবস্থা জানার পরেও যারা কোনোদিন কোনো সাহায্য করেনি তারাও আজ হায় হায় করে আফসোস করতে লাগলো। অনেক সম্মান ও ভালোবাসা, আফসোস ও মন খারাপির সাথে শেষ হলো চৈতীর অসুস্থ বৃদ্ধ মায়ের দাফন।
এ দুনিয়ায় আপন বলে চৈতির আর কেউ ই রইলো না। গ্রামের কিছু মুরুব্বি মহিলা,চৈতীকে শান্তনা দেয়ার জন্য রাতে তার বাসায় থাকতে চাইলো। কিন্তু চৈতী সেটায় রাজি হলো না৷ এমনকি তারা থাকার জোর জবরদস্তি করলেও চৈতী তাদের জানায় সে নিজে সব সামলাতে পারবে।
দু'একজন চৈতীকে খাবার রান্না করে দিয়ে যায়।
বিছানা থেকে উঠে বসে দিভা৷ সে তার নিজস্ব প্লান অনুযায়ী এগিয়ে যাচ্ছে। চৈতীকে শান্তনা দেয়া দরকার। মা হারা একজন মেয়েকে কোনো কিছু দিয়ে বুঝিয়ে শান্ত রাখা যায়না৷ কিন্তু চৈতী একজন শিক্ষক। সে আবেগ ও বাস্তবতার মাঝে পার্থক্য বুঝতে পারে। রুম অন্ধকার করে শুয়ে ছিলো চৈতী। সে গুঙিয়ে গুঙিয়ে কেঁদেই চলেছিলো। মাঝে মাঝে শব্দ করে ডুকরে কেঁদে ওঠে।
অন্ধকার হাতড়ে চৈতীর রুমে আসে দিভা। সে ধীর কন্ঠে চৈতীকে বুঝায়, " আন্টি হয়ত এভাবে অসুস্থ থেকে থেকে কষ্ট পাচ্ছিলেন। সৃষ্টি কর্তা তার অনন্ত শান্তির জন্য তাকে তুলে নিয়ে গেছেন চৈতী। তুমি এভাবে কেঁদো না।কাঁদলে তিনি ফিরে আসবেন না। এর থেকে তার জন্য দোয়া কর। সেটা ভালো হবে। দিভার কথা শুনে কান্না কিছুটা হলেও থামায় চৈতী। সে দিভাকে শক্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, তুমি কবে যাবে?
- আমি খুব শীঘ্রই চলে যাব চৈতী।
তবে তোমাকে নিয়েই যাবো।
- আমি? কেনো তোমার সঙ্গে যাব?
- দুটো কারন, প্রথমত তোমার এখানে আপন বলতে আর কেউ নেই। দ্বিতীয়ত আমাকে তোমার হেল্প করতে হবে।
- এসব বিষয়ে আমি এখন আলোচনা করতে চাচ্ছি না। আমাকে এখন একা থাকতে দাও।
- বেশ। সময় নাও তুমি। তবে তুমি আমার সাথেই যাবে এবং সেটা তোমার ভালোর জন্য ই।
দিভা কথাগুল বলে চলে যায়। কিছুটা অবাক হয় চৈতী। এত অধিকার খাটিয়ে কথা বলছে কেনো মেয়েটি!
দুঃস্বপ্নের একটা রাত পার হয় চৈতীর। সারারাত দু চোখের পাতা এক করতে পারে নি। ধীর পায়ে আবারো চৈতির রুমে আসে দিভা। চৈতী এবার দিভার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়। দিভার গায়ের সকল তাজা ক্ষত একেবারে শুকিয়ে গেছে৷এমকি কপালের কাটা জায়গাটাও।
ক্ষতস্থানগুলোতে শুধুমাত্র দাগ রয়ে গেছে।দেখে মনে হচ্ছে যেন বহুকাল আগে কেটেছিলো। অবাক হলেও কোনোকিছু দিভার কাছে প্রকাশ করে না চৈতী। চৈতীকে উদ্দেশ্য করে দিভা কিছু একটা বলবে এমন সময়ে বাইরে থেকে হ্যান্ড মাইকের আওয়াজ ভেসে আসে-
পুলিশ এ ঘরের চারদিকে অবস্থান নিয়ে আছে। আমরা নিশ্চিত হয়েছি খুনী এ ঘরেই অবস্থান করছে। স্যারেন্ডার না করলে আমরা দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকব। খুনীকে আমরা জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় গ্রেপ্তার করতে চাই"
এক আকাশ অবিশ্বাস নিয়ে চৈতীর দিকে তাকায় দিভা..
শেষমেশ চৈতীর মত মেয়েটাও কি বিশ্বাসঘাতকতা করলো"!
চৈতী নিজেও হ্যান্ড মাইকে এসব কথা শুনে অবাক হয়। সে দিভার দিকে তাকিয়ে ডানে বামে মাথা নাড়ে। বুঝাতে চেষ্টা করে সে কাউকে কোনো কিছুই বলে নি। ..... ( চলবে)
লেখক- Hasibul Islam Fahad.