08/06/2026
কবুতরের আকাশে ঘুমের রহস্য কি?
আপনি জানেন কি কবুতর আকাশে উড়তে উড়তে ঘুমায়?কবুতর Unihemispheric Slow-Wave Sleep বা এক মস্তিষ্কে ঘুম দিয়ে কীভাবে টানা উড়তে পারে।
কবুতর পালকরা প্রায়ই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন একটা হাইফ্লাইয়ার টানা ১০ থেকে ২২ ঘণ্টা আসমানে থাকে কীভাবে? ক্লান্তি লাগে না? ঘুম আসে না? সে কি আসমানে ঘুমায়?
উত্তর হলো হ্যাঁ, সে ঘুমায়। তবে যেভাবে ঘুমায় সেটা মানুষের কল্পনার বাইরে।
ঘুম অপরিহার্য এবং প্রতিটি প্রাণীর মস্তিষ্ককে ঘুমাতেই হবে। ঘুমের সময় মস্তিষ্কের নিউরন মেরামত হয়, স্মৃতি সংহত হয় এবং স্নায়বিক ভারসাম্য ফিরে আসে। ঘুম ছাড়া কোনো প্রাণী দীর্ঘক্ষণ কার্যকর থাকতে পারে না।
কিন্তু আসমানে উড়তে থাকা পাখির সমস্যা হলো মানুষের মতো দুই মস্তিষ্ক একসাথে ঘুমিয়ে পড়লে সে নিচে পড়ে যাবে। তাহলে সে করে কি ?
বিবর্তন এই সমস্যার যে সমাধান বের করেছে সেটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম অবাক করা আবিষ্কার।
Unihemispheric Slow-Wave Sleep বা অর্ধেক মস্তিষ্কে ঘুম।
পাখির মস্তিষ্কের দুটি আলাদা গোলার্ধ (Hemisphere) আছে। USWS বা Unihemispheric Slow-Wave Sleep হলো এমন একটি ঘুমের অবস্থা যেখানে মস্তিষ্কের একটি গোলার্ধ গভীর ঘুমে থাকে, আর অন্য গোলার্ধ সম্পূর্ণ জেগে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে।
EEG বা ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রামে এটি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ঘুমন্ত গোলার্ধে থাকে নিম্নকম্পাঙ্কের উচ্চ-প্রশস্ততার স্লো ওয়েভ, আর জাগ্রত গোলার্ধে থাকে উচ্চকম্পাঙ্কের স্বাভাবিক সজাগ তরঙ্গ। দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা একই সময়ে একই মাথার ভেতরে কাজ করে ।
এই অবস্থায় পাখির একটি চোখ বন্ধ থাকে এবং অন্য চোখ খোলা থাকে। যে চোখ খোলা থাকে সেটি সজাগ গোলার্ধের বিপরীত দিকে অর্থাৎ ডান চোখ খোলা মানে বাম গোলার্ধ জেগে আছে।
কবুতর (Columba livia) নিয়ে সরাসরি গবেষণা আছে। Rattenborg এবং তাঁর দলের গবেষণায় EEG রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে প্রমাণ করা হয়েছে যে কবুতরে USWS ঘটে এবং এই অবস্থায় খোলা চোখের দিক থেকে আসা বিপদ সনাক্ত করার ক্ষমতা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ থাকে।
১৯৯৯ সালে Nature জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখানো হয়েছে পাখিরা শুধু USWS করতে পারে না বরং বিপদের আশঙ্কা বাড়লে তারা স্বেচ্ছায় USWS এর পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ এটি একটি সক্রিয় ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য প্রক্রিয়া, দুর্ঘটনাবশত নয়।
উড়তে উড়তে ঘুমানোর প্রথম সরাসরি প্রমাণ ফ্রিগেটবার্ডের EEG পরীক্ষা।
২০১৬ সালে Nature Communications-এ প্রকাশিত একটি যুগান্তকারী গবেষণায় Max Planck Institute-এর Niels Rattenborg এবং University of Zurich-এর Alexei Vyssotski মিলে উড়ন্ত পাখির মাথায় ক্ষুদ্র EEG রেকর্ডার লাগিয়ে প্রথমবারের মতো প্রমাণ করেন যে পাখি সত্যিই আকাশে উড়তে উড়তে ঘুমায়।
গবেষণায় ব্যবহৃত পাখি ছিল Great Frigatebird (Fregata minor) যারা গ্যালাপাগোস দ্বীপ থেকে টানা ১০ দিন এবং ৩,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত না থেমে উড়তে পারে।
ফলাফল ছিল অবাক করা। দিনের বেলা পাখিগুলো সম্পূর্ণ জেগে খাবার খুঁজত। সূর্য ডোবার পর থার্মাল বায়ু ব্যবহার করে বৃত্তাকারে ঘুরতে ঘুরতে তারা USWS-এ যেত। কখনো এক গোলার্ধে, কখনো বিরল ক্ষেত্রে দুই গোলার্ধেই। উড়ন্ত অবস্থায় তারা প্রতিদিন মাত্র গড়ে ৪২ মিনিট ঘুমাত, যেখানে মাটিতে বিশ্রামের সময় প্রতিদিন প্রায় ১২ ঘণ্টা ঘুমাত। এই ঘুমের ঘাটতি (Sleep Debt) মাটিতে ফিরে এসে পূরণ করতো।
কবুতর এবং বিশেষ করে হাইফ্লাইয়ার কবুতরের সাথে এর সম্পর্ক কি?
একটি খাঁটি হাইফ্লাইয়ার যখন ১০-২২ ঘণ্টা আসমানে থাকে, তখন সে যে শুধু শারীরিক শক্তিতে উড়ছে তা নয় তার মস্তিষ্ক পালাক্রমে বিশ্রাম নিচ্ছে। থার্মাল বায়ুতে বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকার সময় USWS সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়, কারণ তখন ডানা ঝাপটানোর দরকার কম থাকে।
হোমার বনাম গিরিবাজ USWS ক্ষমতায় কে এগিয়ে?
এই প্রশ্নটি কবুতর পালকদের মনে স্বাভাবিকভাবেই আসে। কিন্তু সৎভাবে বলতে হলে হোমার ও গিরিবাজের মধ্যে USWS ক্ষমতার সরাসরি তুলনামূলক গবেষণা এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানে হয়নি। এই নির্দিষ্ট প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেওয়ার মতো পিয়ার রিভিউড ডেটা এখনো বিদ্যমান নেই।
তবে বিদ্যমান বিজ্ঞান থেকে যুক্তিসংগত বিশ্লেষণ করা সম্ভব।
USWS কখন সবচেয়ে কার্যকর হয়?
Rattenborg et al. (2016)-এর গবেষণায় স্পষ্ট দেখা গেছে উড়ন্ত পাখি USWS-এ সবচেয়ে বেশি যায় থার্মাল বায়ু ব্যবহার করে বৃত্তাকারে ঘুরে ভাসতে থাকার সময়। এই মুহূর্তে ডানা ঝাপটানোর দরকার কম, শরীরের উপর যান্ত্রিক চাপ কম এবং মেরুদণ্ডীয় স্বয়ংক্রিয় প্রতিবর্ত দিয়ে উড়ান নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। ফলে মস্তিষ্কের গোলার্ধ পালাক্রমে বিশ্রাম নিতে পারে। গিরিবাজের উড়ানের ধরন এই শর্তের সাথে মেলে। একটি খাঁটি হাইফ্লাইয়ার গিরিবাজ আকাশে ওঠার পর থার্মাল বায়ুতে বৃত্তাকারে ঘুরতে ঘুরতে উপরে উঠতে থাকে এবং উচ্চতায় স্থির থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাসে। এই উড়ানের ধরন বৃত্তাকার, থার্মালনির্ভর, কম ডানা ঝাপটানো USWS-এর জন্য সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। এই কারণেই সে ১০ থেকে ২২ ঘণ্টা আকাশে থাকতে পারে। শুধু শারীরিক সহনশীলতায় নয়, মস্তিষ্ককে পালাক্রমে বিশ্রাম দিয়ে।
হোমারের উড়ানের ধরন এই শর্তের বিপরীতে। রেসিং হোমার উড়ে সোজা দ্রুতগতির লাইনে, গন্তব্যের দিকে। এই উড়ানে ক্রমাগত ডানা ঝাপটাতে হয়, বায়ুগতিক নিয়ন্ত্রণে মস্তিষ্ককে সক্রিয় থাকতে হয় এবং থার্মালে ভেসে বিশ্রামের সুযোগ কম। ফলে হোমার ক্লান্ত হলে মাটিতে নেমে বিশ্রাম নেয় এবং আবার ওড়ে।
সহজ কথায় গিরিবাজের উড়ানের স্বভাব USWS ব্যবহারের জন্য স্বাভাবিকভাবেই বেশি অনুকূল। হোমারের উড়ানের স্বভাব USWS এর সুযোগ কম দেয়। তবে এটি উড়ানের ধরনের পার্থক্য দুই জাতের মস্তিষ্কের জৈবিক ক্ষমতার তুলনামূলক পার্থক্য কিনা তা এখনো পরিমাপ করা হয়নি। এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর পেতে হলে দুই জাতের কবুতরের মাথায় EEG রেকর্ডার লাগিয়ে তুলনামূলক পরীক্ষা করতে হবে যা ভবিষ্যতের গবেষণার একটি উন্মুক্ত দরজা।
বর্তমান বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা হলো, এখনো অজানা
কবুতরের বিভিন্ন জাত যেমন খাঁটি হাইফ্লাইয়ার বনাম হোমার মধ্যে USWS এর কার্যকারিতায় পার্থক্য আছে কিনা তা এখনো সরাসরি পরীক্ষা করা হয়নি।
উড়তে উড়তে ডানার নড়াচড়া কতটা স্বয়ংক্রিয় মেরুদণ্ডীয় প্রতিবর্ত দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং USWS এর সময় মস্তিষ্ক থেকে ঠিক কতটুকু নির্দেশ দরকার হয় তা নিয়ে গবেষণা চলছে।
কতক্ষণ না ঘুমিয়ে থাকা একটি হাইফ্লাইয়ার সহ্য করতে পারে এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে পারফরম্যান্সকে কীভাবে প্রভাবিত করে তার পরিমাপযোগ্য ডেটা এখনো অপ্রতুল।
তবে ভবিষ্যতে আশা করা যায় কোন গবেষণা হয়তো আমাদের এ ব্যাপারে জ্ঞানের দরজাকে আরও খুলবে।
ফুল রেফারেন্স ও স্পেসিফিক গবেষণাপত্র:
Rattenborg, N. C., Lima, S. L., & Amlaner, C. J. (1999)
Half-awake to the risk of predation.
Nature, 397, 397–398.
DOI: 10.1038/17037
মূল কথা: পাখি USWS-এর সময় আসন্ন বিপদ শনাক্ত করতে পারে এবং বিপদের মাত্রা অনুযায়ী স্বেচ্ছায় USWS-এর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে — এর প্রথম পিয়ার-রিভিউড প্রমাণ।
Rattenborg, N. C., Lima, S. L., & Amlaner, C. J. (1999)
Facultative control of avian unihemispheric sleep under the risk of predation.
Behavioural Brain Research, 105(2), 163–172.
DOI: 10.1016/S0166-4328(99)00070-4
মূল কথা: EEG বিশ্লেষণে mallard duck ও কবুতরে USWS-এর সময় চোখের অবস্থা এবং জাগ্রত গোলার্ধের কার্যকারিতার বিস্তারিত নিউরোফিজিওলজিক্যাল প্রমাণ।
Rattenborg, N. C., Amlaner, C. J., & Lima, S. L. (2000)
Behavioral, neurophysiological and evolutionary perspectives on unihemispheric sleep.
Neuroscience & Biobehavioral Reviews, 24(8), 817–842.
DOI: 10.1016/S0149-7634(00)00039-7
মূল কথা: পাখি ও জলজ স্তন্যপায়ীদের USWS-এর বিবর্তনীয় কারণ, নিউরোলজিক্যাল প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন প্রজাতিতে এর প্রকাশভঙ্গির সামগ্রিক পর্যালোচনা।
Rattenborg, N. C., Voirin, B., Cruz, S. M., Tisdale, R., Dell'Omo, G., Lipp, H. P., Wikelski, M., & Vyssotski, A. L. (2016)
Evidence that birds sleep in mid-flight.
Nature Communications, 7, 12468.
DOI: 10.1038/ncomms12468
মূল কথা: উড়ন্ত Great Frigatebird-এর মাথায় EEG রেকর্ডার লাগিয়ে প্রথমবারের মতো প্রমাণ করা হয়েছে যে পাখি সত্যিই আকাশে উড়তে উড়তে USWS ও REM উভয় ধরনের ঘুমে যায় এবং থার্মাল বায়ুতে বৃত্তাকারে ঘোরার সময় এটি সবচেয়ে বেশি ঘটে।
বিশেষ নোট: এই লেখার সমস্ত রেফারেন্স Nature, Nature Communications, Behavioural Brain Research ও Neuroscience & Biobehavioral Reviews-সহ আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত এবং DOI নম্বরসহ যাচাইযোগ্য। হোমার বনাম গিরিবাজের তুলনামূলক অংশটি বিদ্যমান বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে যুক্তিসংগত বিশ্লেষণ, চূড়ান্ত দাবি নয় এবং তা লেখায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি কবুতর প্রেমীদের মধ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনার একটি প্রয়াস।
এই লেখার সর্বস্বত্ব কপিরাইট আইনে © Fahad Ahammed কর্তৃক সংরক্ষিত তবে লেখাটি শেয়ার করতে কোন বাধা নেই