24/08/2026
হায় সম্রাট! আমার বুকটা যদি জমি হতো তোকে রেখে দিতাম।
সম্রাট নামের হাতিটিকে দেখে আজ আমার চোখে পানি এসেছিল।
অথচ এই চোখকে কাঁদানো খুব সহজ কাজ নয়।
এত বছর ধরে এত রক্ত দেখেছি, এত আহত শরীর কোলে তুলেছি, এত প্রাণীকে বাঁচানোর চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর হাতে তুলে দিতে হয়েছে কাঁদতে কাঁদতে একসময় কান্নাটাই যেন ক্লান্ত হয়ে গেছে।
আমি ভেবেছিলাম আমার বুকটা পাথর হয়ে গেছে।
সম্রাটকে দেখে বুঝলাম
পাথরও কাঁদে।
শুধু তার চোখের পানি বাইরে আসতে একটু বেশি সময় লাগে।
Bangla TV Europe-এ সম্রাটের ঘটনাটা দেখছিলাম।
একটা বিশাল শরীর।
অথচ তার চেয়েও বিশাল অসহায়ত্ব।
দেখতে দেখতে হঠাৎ খুব ইচ্ছে হলো
ওকে নিয়ে আসি।
তারপর নিজের মনেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম,
কোথায় নিয়ে আসবি, আরিজ?
আমার কোনো জায়গা নেই!
একটা অসুস্থ বিড়াল রাস্তা থেকে তুলে হাসপাতালে নিলে তার বিল মেটাতে গিয়ে জান বের হয়ে যায়। ফস্টারের খরচ জোগাড় করতে রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়।
আর এ তো একটা হাতি!
তাকে রাখব কোথায়?
খাওয়াব কী?
চিকিৎসা করাব কী দিয়ে?
সেদিন নিজের দারিদ্র্যকে প্রথমবার টাকার অভাব বলে মনে হয়নি।
মনে হয়েছে
ক্ষমতার অভাব।
হায় সম্রাট,
আমার বুকটা যদি জমি হতো,
তোকে সেখানেই রেখে দিতাম।
আমার মায়া যদি টাকা হতো,
তোকে কিনে মুক্ত করে দিতাম।
কিন্তু বিধাতা বড় অদ্ভুত হিসাবরক্ষক
যার বুকের মধ্যে পাহাড়সম মায়া দিলেন
তার হাতেই হয়তো দিলেন কয়েক মুঠো সামর্থ্য।
আর যাদের হাতে পাহাড়সম সামর্থ্য,
তাদের সবার বুকে মায়া দিলেন না।
এই আফসোস আমি কোথায় রাখি?
আমাদের দেশে বড় বড় সংগঠন আছে। শত কোটি টাকার অনুদানের গল্প আছে। তাদের কাছে সম্রাটের দায়িত্ব নেওয়া আমার মতো সাধারণ মানুষের মতো অসম্ভব হওয়ার কথা নয়।
সম্রাটের গল্পও তো আজকের নয়।
এর আগেও ওর ঘটনা ভাইরাল হয়েছিল।
প ফাউন্ডেশনের রাকিবুল এমিলের মাধ্যমে উদ্ধারের গল্প হয়েছিল।
কোটি টাকা অনুদান তুলেছিলো সে।
সাফারি পার্কে দেওয়া হয়েছিল।
তারপর সেই সাফারি পার্ক থেকেই আবার তাকে আগের মালিকের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হলো।
কী চমৎকার আমাদের উদ্ধার!
আগুন থেকে তুলে এনে
কিছুদিন পর আবার আগুনের কাছেই রেখে এলাম!
তারপর ফিরে এসে নিজেদের উদ্ধারকারী বললাম।
এরপর আবার সম্রাটকে নিয়ে চাঁদা তুলতে বের হওয়া হলো।
ক্ষুধায় ও দোকান ভেঙে খাবার খুঁজতে চেষ্টা করল।
তারপর...
অন্ধকারের মধ্যে দূরে গিয়ে লুকিয়ে রইল।
এই জায়গাটায় এসে আমি আর নিজেকে সামলাতে পারিনি।
একটা হাতি অন্ধকারে গিয়ে লুকিয়েছে।
মানুষ হাতিকে দেখে ভয় পায়
কিন্তু সেদিন একটা হাতিই মানুষকে ভয় পেয়ে অন্ধকার বেছে নিয়েছিল।
সম্রাটকে যদি কখনো সামনে পেতাম, হয়তো জিজ্ঞেস করতাম অন্ধকারে এত দূরে গিয়ে বসেছিলি কেন রে?
হয়তো সে উত্তর দিত অন্ধকার আমাকে কোনোদিন মারেনি।
মানুষ মেরেছে।
আমি আর কী উত্তর দিতাম?
হয়তো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতাম।
কারণ কিছু অভিযোগের জবাব ভাষায় দেওয়া যায় না।
শুধু লজ্জায় দেওয়া যায়।
আমরা নিজেদের মানুষ বলি।
কী অসম্ভব দম্ভ!
নিজের বিষণ্ণতার কাছে শব্দ ধার নিয়ে বলতে ইচ্ছে করে
হে মানুষ, পশুকে শিকল পরিয়ে এত গর্ব করিস না;
একদিন আয়নার সামনে দাঁড়াস
দেখবি, শিকলটা তার পায়ে ছিল,
পশুত্বটা ছিল তোর ভেতরে।
জীবনে বহুবার জেল খেটেছি।
রাজনীতি করতাম।
অনেক কষ্ট গেছে।
নিজের জন্য কখনো এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলিনি।
এখন আর রাজনীতি করি না।
যুদ্ধ ভালো লাগে না বলে নয়।
আমি এখনও যুদ্ধ করি।
শুধু আমার যুদ্ধের কারণ বদলে গেছে।
আগে নিজের দাম্ভিকতার জন্য যুদ্ধ করেছি।
এখন যুদ্ধ করি ওদের জন্য।
যাদের কোনো দল নেই।
কোনো মিছিল নেই।
কোনো ব্যালট নেই।
কোনো বক্তৃতা নেই।
আছে শুধু দুটো চোখ।
আর সেই চোখের ভাষায় একটা প্রশ্ন
মানুষ, তোর পৃথিবীতে জন্ম নেওয়াটাই কি আমার অপরাধ ছিল?
এই প্রশ্নটার উত্তর আজও খুঁজে পাইনি।
আল্লাহ আমাকে অনেক টাকা দেননি।
মাঝে মাঝে তাঁর কাছে অভিমান হয়।
বলতে ইচ্ছে করে হে আল্লাহ, এত মায়া যখন দিলে,
তখন মায়াগুলোর দায়িত্ব নেওয়ার মতো সামর্থ্যটুকুও দিলে না কেন?
আমি ধনী হতে চাই প্রাসাদের জন্য নয়।
দামি গাড়ির জন্য নয়।
আমি শুধু একদিন এতটা সামর্থ্যবান হতে চাই, যেন কোনো আহত প্রাণীর চোখের দিকে তাকিয়ে আর বলতে না হয় তোর জন্য আমার খুব কষ্ট হচ্ছে,
কিন্তু তোকে বাঁচানোর ক্ষমতা আমার নেই।
এই একটি বাক্য আমাকে ভেতর থেকে মেরে ফেলে।
সম্রাট,
মাফ করে দিস আমাদের।
বিশেষ করে আমাদের, যারা প্রাণী নিয়ে কাজ করি।
আমরা rescue করি।
Foundation বানাই।
Donation তুলি।
ছবি তুলি।
পোস্ট লিখি।
নিজেদের animal lover বলি।
অথচ এত বছর পরও তোর পায়ের শিকল খুলতে পারিনি।
তাই আজ তোকে ভালো থাকিস বলব না।
এই পৃথিবীতে তোর ভালো থাকার ব্যবস্থা আমরা রাখিনি।
বরং আল্লাহর কাছে নিষ্ঠুর একটা দোয়া করি।
হে আল্লাহ,
যদি এই পৃথিবীতে সম্রাটের জন্য আর একটাও শান্ত সকাল লেখা না থাকে
তবে তাকে আর মানুষের কাছে রেখো না।
তাকে তোমার কাছে নিয়ে যাও।
সেখানে হয়তো কেউ তাকে চাঁদা তোলার জন্য রাস্তায় নামাবে না।
ক্ষুধায় দোকান ভাঙতে হবে না।
কারও মনোরঞ্জনের জন্য মাথা নোয়াতে হবে না।
কেউ তাকে উদ্ধার করে আবার তার নির্যাতনকারীর কাছেও ফিরিয়ে দেবে না।
আর সবচেয়ে বড় কথা
মানুষের কাছ থেকে বাঁচতে
অন্ধকারে গিয়ে লুকাতে হবে না।
যাওয়ার আগে যদি কোনোদিন মানুষের ভাষা বুঝতে পারিস, সম্রাট, শুধু এটুকু শুনে যাস
তুই আমাদের ক্ষমা করে দিস।
কারণ তুই কোনোদিন মানুষ হতে পারিসনি
এটাই তোর সৌভাগ্য।
আর আমরা মানুষ হয়ে জন্মেছি
এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।