22/04/2026
"যে হাদিস বর্ণনা করতে গিয়ে তিনবার জ্ঞান হারিয়েছিলেন প্রখ্যাত সাহাবী আবু হুরায়রা (রা.)!"
সহীহ হাদিসটি বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং ঈমান জাগানিয়া। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই হাদিসটি মূলত আমাদের ইবাদতের 'প্রাণ' তথা ইখলাস বা নিয়তের বিশুদ্ধতা নিয়ে ভাববার সুযোগ করে দেয়।
📢 সাবধান! যাদের দিয়ে শুরু হবে জাহান্নামের উদ্বোধন!
আমরা ভাবি—মস্ত বড় আলেম, অকাতরে দান করা দানবীর কিংবা দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া শহীদ সরাসরি জান্নাতে যাবেন। কিন্তু কিয়ামতের কঠিন ময়দানে দৃশ্যপট হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর বর্ণিত একটি সহীহ হাদিস অনুযায়ী, কিয়ামতের দিন বিচারকাজ শুরুই হবে এমন তিন ব্যক্তিকে দিয়ে, যাদের আমরা দুনিয়াতে পরম শ্রদ্ধার চোখে দেখতাম। কিন্তু তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম।
১. সেই শহীদ:
যার লড়াই ছিল 'বীর' হওয়ার জন্য ⚔️
বিচারের কাঠগড়ায় প্রথমে আনা হবে একজন শহীদকে। আল্লাহ তাকে দেওয়া নেয়ামতগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সে তা স্বীকার করবে।
প্রশ্ন: "তুমি এসব নেয়ামতের বিনিময়ে কী করেছ?"
উত্তর: "প্রভু, আমি তোমার পথে লড়াই করেছি এবং শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি।"
আল্লাহ বলবেন: "তুমি মিথ্যা বলছ! তুমি লড়াই করেছিলে যাতে মানুষ তোমাকে 'বীর'** বা 'বাহাদুর' বলে। আর দুনিয়াতে তা বলা হয়েছে (তুমি তোমার পাওনা পেয়ে গেছ)।"
এরপর ফেরেশতাদের নির্দেশ দেওয়া হবে তাকে উপুড় করে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে।
২. সেই আলেম: যার জ্ঞান ছিল 'বাহবা' পাওয়ার মাধ্যম 📖
এরপর আনা হবে একজন বিখ্যাত আলেম বা ক্বারী সাহেবকে।
প্রশ্ন: "তুমি তোমার অর্জিত জ্ঞান দিয়ে কী করেছ?"
উত্তর: "আমি নিজে দ্বীন শিখেছি, অন্যকে শিখিয়েছি এবং তোমার সন্তুষ্টির জন্য কুরআন তিলওয়াত করেছি।"
আল্লাহ বলবেন: "মিথ্যা কথা! তুমি ইলম অর্জন করেছিলে যাতে মানুষ তোমাকে 'বড় আলেম' বলে, আর কুরআন পড়েছিলে যাতে সবাই তোমাকে 'ভালো ক্বারী' বলে। দুনিয়াতে তোমার প্রশংসা করা হয়েছে।"
পরিণামস্বরূপ, তাকেও অসম্মানজনকভাবে জাহান্নামে ছুড়ে ফেলা হবে।
৩. সেই দানবীর:
যার দান ছিল 'যশ-খ্যাতি'র নেশা 💰
সবশেষে আনা হবে সেই দানবীরকে, যাকে আল্লাহ অঢেল সম্পদ দিয়েছিলেন।
প্রশ্ন: "তোমার সম্পদের ব্যবহার কীভাবে করেছ?"
উত্তর: "এমন কোনো ভালো কাজ নেই যেখানে আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্য দান করিনি।"
আল্লাহ বলবেন: "তুমি ভুল বলছ! তুমি দান করেছিলে যাতে লোকে তোমাকে 'বিরাট দাতা' বা 'দানবীর' বলে। তোমার সেই উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।"
আফসোস! তার এই বিশাল দান আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না এবং তাকেও জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে।
“যে কেউ পার্থিব জীবন ও এর সৌন্দর্য কামনা করে, আমি দুনিয়াতে তাদের কর্মের পূর্ণ ফল প্রদান করে থাকি এবং সেখানে তাদেরকে কম প্রদান করা হবে না। তাদের জন্য পরকালে জাহান্নাম ব্যতীত আর কিছু নেই এবং তারা যা করে আখিরাতে তা নিষ্ফল হবে এবং তারা যা করে থাকে তা বিফলে যাবে" (সূরাঃ হুদ- আয়াত ১৬)।
📚 হাদিসের দলিলঃ -
এই ভয়াবহ পরিণামের কথা বর্ণিত হয়েছে
📚সহীহ মুসলিম হাদিস নং ১৯০৫ এবং 📚সুনানে তিরমিজিতে হাদিস নং ২৩৮২)।
এই হাদিসটি শোনার পর প্রখ্যাত সাহাবী আবু হুরায়রা (রা.) তিনবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন!
সহীহ মুসলিমের মূল হাদিসটিতে (১৯০৫ নম্বর) সরাসরি আবু হুরায়রা (রা.)-এর জ্ঞান হারানোর ঘটনাটি বিস্তারিত উল্লেখ নেই। সেখানে শুধু রাসুলুল্লাহ (ছা.)-এর বর্ণনাটি রয়েছে।
তবে এই একই হাদিস যখন ইমাম তিরমিযী রহ. তাঁর 'সুনানে তিরমিজি' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, সেখানে তিনি হাদিসটির প্রেক্ষাপট বা এর বর্ণনাকারী আবু হুরায়রা (রা.)-এর অবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন।
সুনানে তিরমিজিতে হাদিস নং ২৩৮২
সেখানে হাদিসটি বর্ণনার পেছনের সম্পূর্ণ ঘটনা (আবু হুরায়রা রা.-এর অবস্থা) বিস্তারিত দেওয়া হয়েছে।
আমাদের জন্য শিক্ষা কী?
এই হাদিসটি আমাদের প্রতিটি কাজের পেছনে লুকিয়ে থাকা 'উদ্দেশ্য' নিয়ে প্রশ্ন তোলে!
নিয়াতের বিশুদ্ধতা: আপনি কত বড় কাজ করছেন তার চেয়ে বড় বিষয় হলো—কেন করছেন? মানুষের প্রশংসা পাওয়ার ইচ্ছা (রিয়া) ইবাদতকে ধ্বংস করে দেয়।
লোকদেখানো ইবাদত শিরক:
রাসুল (ছা.) লোকদেখানো ইবাদতকে 'ছোট শিরক' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
আমাদের প্রতিটি ইবাদত—সেটা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা হোক বা বাস্তবে—তা কি আল্লাহর জন্য নাকি কেবল লাইক-কমেন্ট আর সম্মানের জন্য?
মনে রাখবেন, আল্লাহ আমাদের বাহ্যিক অবয়ব বা সম্পদ দেখেন না, তিনি দেখেন আমাদের অন্তর এবং আমাদের কাজের উদ্দেশ্য। (সহীহ মুসলিম)
আসুন আমরা নিজেদের প্রশ্ন করি, আমাদের আজকের ইবাদতগুলো কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, নাকি মানুষের বাহবার জন্য?
আল্লাহ আমাদের সবাইকে 'রিয়া' বা লোকদেখানো মানসিকতা থেকে হেফাজত করুন এবং কবুলযোগ্য ইবাদত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।