23/05/2026
একদিন আল্লাহ আপনাকে দেখিয়ে দেবেন, কেন এই কষ্টকর অপেক্ষার প্রয়োজন ছিল। তাই আপাতত দোয়া করতে থাকুন। দরজা না খোলা পর্যন্ত তাতে কড়া নাড়তে থাকুন। বিলম্বের কল্যাণের উপর বিশ্বাস রাখতে থাকুন। সর্বোপরি, সবকিছুর সঠিক সময় একমাত্র আল্লাহই জানেন।
মানুষ স্বভাবতই চায় তার প্রার্থনার উত্তর দ্রুত পেতে, তার কষ্ট দ্রুত দূর হোক এবং তার কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি তাড়াতাড়ি অর্জিত হোক। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম জ্ঞান ও হিকমত অনুযায়ী সবকিছুর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে রেখেছেন। আমরা বর্তমান দেখি, কিন্তু তিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবকিছু জানেন। তাই অনেক সময় যে বিষয়টি আমরা আজ চাইছি, সেটি যদি এখনই পেয়ে যাই তবে হয়তো তা আমাদের জন্য ক্ষতির কারণ হবে। আর যে বিষয়টি পেতে দেরি হচ্ছে, সেই বিলম্বের মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় কল্যাণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“হতে পারে তোমরা কোনো বিষয়কে অপছন্দ কর, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হতে পারে তোমরা কোনো বিষয়কে ভালোবাসো, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জানো না।” (সূরা আল-বাকারা ২:২১৬)
দোয়া কখনোই বিফলে যায় না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“বান্দার দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ সে গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া না করে এবং তাড়াহুড়া না করে।” সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, তাড়াহুড়া কী? তিনি বললেন, “সে বলে: আমি দোয়া করেছি, আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হতে দেখছি না। অতঃপর সে হতাশ হয়ে দোয়া করা ছেড়ে দেয়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৩৫)
অর্থাৎ, দোয়ার উত্তর দেরিতে আসছে বলে দোয়া বন্ধ করে দেওয়া একজন মুমিনের কাজ নয়। বরং দোয়া চালিয়ে যাওয়া, আল্লাহর প্রতি সুদৃঢ় বিশ্বাস রাখা এবং ধৈর্য ধারণ করাই প্রকৃত ঈমানের পরিচয়।
নবী ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের দিকে তাকালে আমরা অপেক্ষার অসাধারণ শিক্ষা পাই। তিনি শৈশবে ভাইদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কূপে নিক্ষিপ্ত হন, দাস হিসেবে বিক্রি হন, অন্যায়ভাবে কারাগারে বন্দি থাকেন। বছরের পর বছর কষ্ট ও অপেক্ষার পর আল্লাহ তাঁকে মিসরের ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। যদি তাঁর জীবনের কোনো একটি কষ্টকর অধ্যায় না ঘটত, তবে হয়তো সেই মহিমান্বিত পরিণতিও আসত না। তখন তিনি বুঝেছিলেন, প্রতিটি বিলম্ব ও প্রতিটি পরীক্ষার পেছনেই ছিল আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনা।
নবী মূসা (আ.)-এর ঘটনাও একই শিক্ষা দেয়। ফিরআউনের অত্যাচার থেকে মুক্তির জন্য তিনি ও তাঁর অনুসারীরা অপেক্ষা করেছিলেন। যখন সামনে সমুদ্র আর পেছনে শত্রুসেনা, তখন সবাই ভেবেছিল সব শেষ। কিন্তু সেই মুহূর্তেই আল্লাহ সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত করে এমন পথ খুলে দিলেন, যা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। মানুষের চোখে যখন সব দরজা বন্ধ, আল্লাহ তখনও নতুন দরজা খুলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
আমাদের জীবনেও এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যার অর্থ আমরা তখন বুঝতে পারি না। একটি চাকরি না পাওয়া, একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, একটি পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়া বা দীর্ঘদিন কোনো দোয়া কবুল না হওয়া—এসব কারণে আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। কিন্তু কিছুদিন বা কয়েক বছর পরে ফিরে তাকিয়ে অনেকেই উপলব্ধি করেন, “আলহামদুলিল্লাহ, তখন যা চেয়েছিলাম তা পেলে আজ হয়তো আমি আরও বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতাম।” তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে আল্লাহর বিলম্ব আসলে প্রত্যাখ্যান নয়; বরং উত্তম সময়ের জন্য সংরক্ষণ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“দোয়ার মাধ্যমে হয়তো বান্দাকে তাৎক্ষণিকভাবে তার চাওয়া দেওয়া হয়, অথবা তা আখিরাতের জন্য সঞ্চিত রাখা হয়, কিংবা সমপরিমাণ কোনো বিপদ তার থেকে দূর করে দেওয়া হয়।” (মুসনাদ আহমাদ)
তাই যখন আপনার মনে হবে যে অপেক্ষা খুব দীর্ঘ হয়ে গেছে, তখন স্মরণ করুন—আল্লাহ নীরব থাকলেও উদাসীন নন। তিনি আপনার কান্না দেখেন, আপনার কষ্ট জানেন এবং আপনার প্রতিটি দোয়া শুনছেন। হয়তো তিনি আপনাকে এমন কিছু দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যা আপনার কল্পনারও বাইরে।
সুতরাং দোয়া থামাবেন না, ধৈর্য হারাবেন না, আর আল্লাহর ফয়সালার প্রতি আস্থা হারাবেন না। কারণ একদিন আপনি নিজেই দেখবেন, কেন এই অপেক্ষা প্রয়োজন ছিল। তখন বুঝবেন, প্রতিটি বিলম্বের আড়ালে ছিল তাঁর অপার রহমত, হিকমত ও কল্যাণ। আর তখন হৃদয় থেকে বেরিয়ে আসবে একটাই কথা—
“হে আল্লাহ! আমি তাড়াহুড়া করেছিলাম, কিন্তু আপনার পরিকল্পনাই ছিল সবচেয়ে সুন্দর।” 🤍